বিএনপি এখন সরকার গঠনের প্রস্তুতি পর্বে। এতেই আপাত স্বস্তি খুঁজে পেতে শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। দলের একটি ক্ষুদ্র অংশ ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে আসছে। কেউ কেউ দীর্ঘদিন পর নিজ এলাকায় ঘুরেও এসেছেন। যদিও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতাকর্মী এখনও গ্রেপ্তার আতঙ্কে আছেন।
সর্বশেষ গতকাল রোববার বিকেলে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দীন।
এর আগে গত শনিবার দুপুরের পর জনা পাঁচেক রিকশা ও ভ্যানচালক এবং হকার রাজধানীতে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গিয়ে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। লুঙ্গি পরিহিত এই লোকগুলো সেখানে স্যালুট দিয়েছেন। এক পর্যায়ে তারা কার্যালয়-সংলগ্ন একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে জাতীয় পতাকা টানিয়ে দেন। অবশ্য গতকাল রোববার ওই স্থানে জাতীয় পতাকাটি আর দেখা যায়নি।
৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ১০ তলা ভবনটি ছাত্র-জনতার রোষানলে পড়ে। ভেতরে তছনছের পর কার্যালয়টি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ভেঙে ফেলা হয় কার্যালয়ের সামনের দিকের দেয়ালে থাকা বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল। তখন থেকে ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে।
দীর্ঘদিন পর এলাকায় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ নিজের এলাকায় যাচ্ছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে। তারা গত প্রায় ১৭ মাস ধরে আত্মগোপনে ছিলেন। গত শুক্রবার নরসিংদীর রায়পুরায় গিয়ে দলের মির্জাপুর ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মির্জা আমির হোসেনের জানাজায় অংশ নেন দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কার্যনির্বাহী সংসদের সাবেক সদস্য অ্যাডভোকেট এবিএম রিয়াজুল কবির কাওসার। এ সময় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীর পাশাপাশি উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ফায়জুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
খুলনায় বিকেলে ফুল, রাতে আগুন
দেড় বছর পর গতকাল খুলনা নগরীর শঙ্খ মার্কেটে অবস্থিত আওয়ামী লীগের মহানগর ও জেলা কার্যালয়ে গিয়েছেন নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনার ছবিতে ফুলের মালা দেন এবং জাতীয় পতাকা ধরে ছবি তোলেন। পাঁচ থেকে সাত মিনিট অবস্থানের পর নেতাকর্মীরা চলে যান।
সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রাতে অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্রদের ব্যানারে বেশ কিছু তরুণ আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে যান এবং দরজা ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেন। ফায়ার সার্ভিস আসার আগে আগুন নিভে যায়।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে ছাত্র-জনতার সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। কার্যালয় থেকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে আন্দোলনকারীরা ওই কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেই থেকে কার্যালয়টি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল।
গতকাল সন্ধ্যায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, সোনাডাঙ্গা থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক টি এম আরিফ হোসেন, সদর থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়েজুল হক রুবেল, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জাহাঙ্গীর হোসেন, জাকির হাসানসহ ১০-১২ নেতাকর্মী শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবিতে ফুলের মালা দিচ্ছেন। এ সময় ছোট একটি জাতীয় পতাকা ধরে তাদের কয়েকজন ছবিও তোলেন।
বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে সদর থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়েজুল হক রুবেল বলেন, ‘দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ও আমরা লুটপাট করিনি। যার কারণে আমরা পালিয়েও যাইনি। এখনও আমরা সুস্থ রাজনীতি করতে চাই। এই বার্তা দিতেই পার্টি অফিসে গিয়েছি।’
আহত জুলাইযোদ্ধা রাফসানজানি সমকালকে বলেন, ‘আমার শরীরে ১১টি গুলি লাগে। এখনও কষ্ট পাই। আমরা কষ্ট বয়ে বেড়াব, ওরা রাজনীতি করবে– এটা হতে দেব না।’
খুলনা সদর থানার ওসি মো. কবির হোসেন বলেন, ‘আমরা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ যাচাই করে তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি।’
দিনাজপুর কার্যালয়ে স্লোগান, বিক্ষোভ
গতকাল দুপুরে দিনাজপুরের বাসুনিয়াপট্টিতে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে প্রবেশ করে স্লোগান দিয়েছেন কয়েকজন নেতাকর্মী। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, দলের স্থানীয় নেতা খালেদ হাবিব সুমন, রহমতুল্লাহ রহমত, সৈয়দ সালাহ উদ্দিন দিলীপ, রুহানা নিশাত বীথি, আশরাফুল আলম, আরিফুজ্জামান, মনজুরুল ইসলাম, আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ কার্যালয়ে প্রবেশ করে স্লোগান দিচ্ছেন।
এ ঘটনার পর বিকেলে জুলাইযোদ্ধা ব্যানারে কয়েকজন গিয়ে ওই কার্যালয়ে জ্বালানি কাঠ দিয়ে আগুন ধরিয়ে বিক্ষোভ করেছে।
আওয়ামী লীগের জেলা কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের যাওয়া ও স্লোগান দেওয়ার ঘটনা জানাজানির পর তালা খুলে বীরগঞ্জ উপজেলা কার্যালয়ে প্রবেশ করেন রোকনুজ্জামান বিপ্লব, মোনায়েম মিঞা, গোলাম মোস্তফা, প্রভাষক জিয়াউর রহমান জিয়াসহ কয়েকজন নেতাকর্মী।
পীরগঞ্জে পতাকা উত্তোলন
গতকাল বিকেলে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় নেতা গোলাম রব্বানী, মোজাহারুল ইসলাম, সুমন মণ্ডল, রিগান, সাগর ও কবির ইসলাম।
পঞ্চগড়ের কার্যালয়ে বসবেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা
গত শুক্রবার সকালে পঞ্চগড়ের চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলে দিয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধান। এ সময় সেখানে অন্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা কামরুজ্জামান বুলেট, আবুল হোসেন, আনিসুজ্জামান স্বপন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন বলেন, এই কার্যালয়টি আপাতত ব্যবহার করবেন স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা।
ক্ষুব্ধ নেতারা আশাবাদী
আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা বলেছেন, বিভিন্ন স্থানে দলের কার্যালয় খুলে দেওয়ার ঘটনাকে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও ইতিবাচকভাবে দেখছেন তারা। এতে তারা বেশ আশাবাদী হয়ে উঠছেন। তারা এও বলেছেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সহিংসতা, প্রাণহানি এবং আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। গ্রেপ্তারও অব্যাহত আছে। এই নেতারা রোববার গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা সভাপতি কারাবন্দি উপাধ্যক্ষ শামিকুল ইসলাম সরকার লিপনের মৃত্যু এবং গত শনিবার ভোলার চরফ্যাসনে দলের স্থানীয় নেতা আবদুর রহিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ব্যালটে নৌকা প্রতীক না থাকলেও সংসদ নির্বাচনের আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বেশ কদর ছিল। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থী তাদের পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করলে নানা ছাড় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। দল দুটি সেই প্রতিশ্রুতি কীভাবে রক্ষা করে, তাই এখন দেখার বিষয়।
(প্রতিবেদনের তথ্য পাঠিয়েছেন খুলনা ব্যুরো; দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ ও পঞ্চগড় প্রতিনিধি)
